মায়মুন শরীফ রাইয়ান
৭ নভেম্বর- বিপ্লব ও সংহতি দিবস বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে ঐক্য, আত্মমর্যাদা ও গণমানুষের শক্তির প্রতীক। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সৈনিক ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক গতিপথে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন সূচিত করে। ৭ নভেম্বর তাই শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের স্মারক নয়; এটি জাতীয় সংহতি, পারস্পরিক বিশ্বাস ও দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জাতীয় সংকট কালে জনগণ ও সেনাবাহিনীর ঐক্য এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে সংঘটিত ঘটনাবলির পটভূমি জানা জরুরি। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের ঘটনাবলির শিকড় কেবল ঐ মাসেই নিহিত ছিল না, এর কিছু উপাদান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও বিদ্যমান ছিল। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারতের অভিপ্রায় ও কার্যক্রম ঘিরে প্রবাসী সরকার ও মুক্তিবাহিনীর মধ্যে অস্বস্তি ছিল। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের সময়ে প্রবাসী সরকার ও মুক্তিবাহিনীকে দূরে রাখা, আত্মসমর্পণকারী বাহিনীর অস্ত্র ভারতীয় সেনাবাহিনীর দখলে চলে যাওয়া, ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে পানিবণ্টনে একতরফা আচরণ এবং ২৫ বছরের মৈত্রী চুক্তি- সব মিলিয়ে স্বাধীনতার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন ও ক্ষোভ জমতে থাকে।
স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির মাধ্যমে দেশে এক গভীর সংকট সৃষ্টি করে। রক্ষীবাহিনী গঠন করে বিরোধীদের দমন শুরু হয়, জাসদের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন চলে, হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে সরকারি অব্যবস্থাপনা, লুটতরাজ ও খাদ্যসংকটের কারণে অসংখ্য মানুষ অনাহারে মারা যায়। এসব ঘটনায় সরকারের জনপ্রিয়তা দ্রুত কমে আসে। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা ‘বাকশাল’ প্রতিষ্ঠিত হয়, গণতন্ত্র ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বিলুপ্ত করা হয়। ফলস্বরূপ সেনাবাহিনী, প্রশাসন ও সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট সংঘটিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক ঘটনা। সেনাবাহিনীর একটি অংশের বিদ্রোহে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। মুজিব মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা ও বিভক্তি দেখা দেয়। ২৪ আগস্ট মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান নিযুক্ত হলেও তাঁর ক্ষমতা সীমিত করে রাখা হয়। সেনানিবাসে তখনও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। ১৫ আগস্টের ঘটনার পরবর্তী দিকনির্দেশনা ও দায় নির্ধারণ নিয়ে সেনা অফিসারদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়।
এই উত্তেজনাপূর্ণ প্রেক্ষাপটে ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে এক প্রতিবিপ্লবী অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এই অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয় এবং প্রধান বিচারপতি এএসএম সায়েমকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেওয়া হয়। অভ্যুত্থানের লক্ষ্য হিসেবে সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও পরিণতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে সন্দেহ ও বিতর্ক তৈরি হয়। ভারতের সংবাদমাধ্যমে এই অভ্যুত্থানকে “ঐতিহাসিক” বলে আখ্যা দেওয়া হলেও, বাংলাদেশের সাধারণ সৈনিক ও জনতার কাছে এটি ভারত-সমর্থিত একটি অভ্যুত্থান বলে বিবেচিত হয়েছিল। সৈনিকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় জিয়াউর রহমানের বন্দিত্ব তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। রণাঙ্গনের বীর সেনানায়ক, স্বাধীনতার ঘোষক এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সামরিক নেতা হিসেবে জিয়া তখন সৈনিক ও সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছিলেন।
ঠিক এই সময় জাসদপন্থী গোপন সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের যোগাযোগ ছিল জাসদের সশস্ত্র অঙ্গসংগঠন গণবাহিনীর সঙ্গে। তারা চেয়েছিল একটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটিয়ে “অফিসারমুক্ত সেনাবাহিনী” গঠন করতে। “সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই”- এই স্লোগানেই তারা প্রস্তুতি নেয় এক ব্যাপক বিদ্রোহের। চলমান অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার সুযোগে তারা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এম এ তাহেরের নেতৃত্বে বিপ্লবী ধাঁচের সেনাবাহিনী গঠন ও ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা সাজায়।
৩ নভেম্বরের ঘটনার পর সেনানিবাসে ক্রমে ফুঁসে উঠছিল ক্ষোভ। সৈনিকরা উপলব্ধি করে, যদি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা না যায়, তবে দেশ একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে। ৬ নভেম্বরের গভীর রাতে, অর্থাৎ ৭ নভেম্বর ভোরে শুরু হয় সেই ঐতিহাসিক সৈনিক বিদ্রোহ। ঢাকা সেনানিবাসের বিভিন্ন প্রান্তে সিপাহিরা ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে বিদ্রোহের সূচনা করে। মেজর মহিউদ্দিন ও সুবেদার মেজর আনিসুল হকের নেতৃত্বে দেশপ্রেমিক সৈনিকরা গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করেন জেনারেল জিয়াউর রহমানকে।
সকালে সেনানিবাস থেকে ট্রাক, ট্যাংক ও গাড়িতে করে সৈনিকরা রাস্তায় বেরিয়ে আসে। সাধারণ জনতাও এসে তাদের সাথে যোগ দেয়। জনতা সামরিক ট্রাক ও ট্যাংকের ওপর উঠে আনন্দ করতে থাকে। তৈরি হয় সিপাহি-জনতার এক অভূতপূর্ব সংহতি, অবিস্মরণীয় বিপ্লব। রাস্তা জুড়ে “জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ”, “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে ঢাকা শহর। জিয়াউর রহমান রেডিওতে ভাষণ দিয়ে জাতির উদ্দেশে আহ্বান জানান শান্তি ও সংহতির। তাঁর দৃঢ় নেতৃত্ব, দেশপ্রেমিক অবস্থান ও জনপ্রিয়তার ফলে সেদিন সূর্যোদয়ের ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই জাসদপন্থি প্রতিবিপ্লবের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। আগ্রাসন ও ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অস্তিত্ব রক্ষায় সিপাহি-জনতার এই সম্মিলিত বিপ্লবের দিনটিকে তাই নাম দেয়া হয় সিপাহি- জনতার বিপ্লব তথা বিপ্লব ও সংহতি দিবস।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস আক্রমণে সমগ্র দেশ যখন রক্তাক্ত ও স্তব্ধ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল তখন দিশাহীন ও পলায়নপর। সমগ্র জাতি যখন গভীর হতাশা ও বিভ্রান্তির অন্ধকারে নিমজ্জিত, সেই মহা সংকটের মুহূর্তে, অন্ধকারের বুক চিরে উদিত হয় এক বিপ্লবী, বিদ্রোহী সৈনিক। চট্টগ্রামের আকাশে ভেসে আসে তাঁর কণ্ঠ- “আমি, মেজর জিয়াউর রহমান, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিচ্ছি।” সেই দীপ্ত উচ্চারণে যেন ঘুমন্ত জাতি মুহূর্তেই জেগে ওঠে, সাহস ফিরে পায়, খুঁজে পায় মুক্তির মন্ত্র। জিয়ার সেই সাহসী আহ্বানই হয়ে ওঠে স্বাধীনতার প্রথম দিগন্ত, হয়ে ওঠে জাতির পুনর্জাগরণের শপথ। ঠিক সেদিনের মতো ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর, এক নেতৃত্বশূন্য বিভ্রান্ত সময়ে রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী যখন দিকহারা, ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে নিমজ্জিত, তখন আবারও সেই দৃপ্ত কণ্ঠ, সেই অদম্য সাহস, সেই অবিচল নেতৃত্ব মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এগিয়ে আসেন স্বাধীনতা হারাতে বসা এক সংকটাপন্ন জাতির হাল ধরতে।
কিন্তু কাজটা ছিল ভীষণ কঠিন আর চ্যালেঞ্জিং। তাঁর প্রথম কাজ ছিল বিদ্রোহের পর সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অফিসারদের রক্ত নিতে চাওয়া সৈনিকদের হাতে থাকা অস্ত্র জমা নিয়ে তাদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনা। সৈনিকদের ক্ষোভ প্রশমন ও অফিসারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেন। অত্যন্ত শান্ত কিন্তু দৃঢ় মনোভাব ও বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সৈনিকদের ওপর অফিসারদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃস্থাপনে কাজ শুরু করেন। নভেম্বর-ডিসেম্বরজুড়ে সেনাবাহিনীতে যে নিত্য অভ্যুত্থান পরিস্থিতি চলছিল, জিয়াউর রহমান তাঁর প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি সামলাতে সক্ষম হন।
তিনি দেশের ভেঙে পড়া রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক কাঠামো ঠিক করে জাতিকে চরম অনিশ্চয়তা থেকে স্থিতিশীলতা ও ঐক্যের পথে ফিরিয়ে আনেন। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে তিনি একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থার পরিবর্তন করে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সংবাদপত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনেন। কৃষি, উৎপাদন, পল্লি উন্নয়ন, স্বনির্ভরতা ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শনকে গুরুত্ব দিয়ে জিয়াউর রহমান আধুনিক বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন ও রাষ্ট্রচিন্তায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যান।
৭ নভেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা ও জাতীয় ঐক্যের দিন। এই দিনে সিপাহি-জনতার সম্মিলিত শক্তি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে জাতিকে নতুন করে আত্মবিশ্বাস ও গর্বে উজ্জীবিত করেছিল, যা সংকটময় মুহূর্তে আজও আমাদের পথপ্রদর্শক। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা, আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ ও নানা ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের চেতনা সমান প্রাসঙ্গিক। শুধু অতীতের গৌরব স্মরণ করা নয়, বরং সেই অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের শপথ গ্রহণ করাই ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা। সুতরাং, জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়াই হোক বিপ্লব ও সংহতি দিবসের মূল প্রেরণা।
লেখক- প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান
কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড সরকারি মডেল কলেজ
















