প্রাচীন এই পেঁচাটি রাতের নয়, দিনের বেলায় শিকার করত—জীবাশ্ম বিশ্লেষণে নতুন তথ্য
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পেঁচা বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে রাতের অন্ধকারে শিকার করা একটি নিশাচর পাখি। কিন্তু প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ বছর আগের একটি পেঁচার জীবাশ্ম বিজ্ঞানীদের সামনে তুলে ধরেছে ভিন্ন ইতিহাস। গবেষকদের ধারণা, সেই প্রাচীন পেঁচাটি রাতের বদলে দিনের বেলায় শিকার করত।
জার্মানির মেসেল অঞ্চলের একটি জীবাশ্মস্থল থেকে পাওয়া অসাধারণভাবে সংরক্ষিত পাখিটির দেহাবশেষ বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। পাখিটির নতুন বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘মাসিলাস্ট্রিক্স ব্ল্যাটোফাগা’ (Masillastrix blattophaga)।
জীবাশ্মটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, পাখিটির পাকস্থলীর অংশে পাওয়া গেছে একটি তেলাপোকার অবশেষ। শুধু তাই নয়, পোকাটির দেহের কিছু বৈশিষ্ট্যও জীবাশ্মে সংরক্ষিত রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই তেলাপকার উপস্থিতি পাখিটির খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। পাখিটি সম্ভবত এমন সময়ে শিকার করত, যখন আলো ছিল পর্যাপ্ত। কারণ জীবাশ্মে পাওয়া পোকাটির বৈশিষ্ট্য এবং পাখিটির পালক ও ডানার হাড়ের গঠন দিনের বেলায় সক্রিয় থাকার ধারণাকে সমর্থন করে।
বর্তমান সময়ের অধিকাংশ পেঁচা নিশাচর। অন্ধকারে শিকার ধরার জন্য তাদের শ্রবণশক্তি অত্যন্ত প্রখর। পাশাপাশি ডানার বিশেষ গঠনের কারণে তারা প্রায় শব্দহীনভাবে উড়তে পারে। ফলে রাতের অন্ধকারে শিকার ধরতে সুবিধা হয়।
কিন্তু পেঁচার এই নিশাচর জীবনযাত্রা ঠিক কখন বিবর্তিত হয়েছে, তা এতদিন পরিষ্কার ছিল না।
নতুন জীবাশ্মটি সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করছে। গবেষকদের ধারণা, পেঁচাদের মধ্যে নিশাচর আচরণ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ইওসিন যুগের শেষভাগে। ইওসিন যুগের সময়সীমা ছিল প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৪০ লাখ বছর আগে।
অর্থাৎ আজকের পেঁচাদের মতো রাতের অন্ধকারে শিকার করার অভ্যাস তাদের বিবর্তনের শুরু থেকেই ছিল না। সময়ের সঙ্গে পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনের মাধ্যমে এই আচরণ গড়ে উঠতে পারে।
জার্মানির মেসেল পিট ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হিসেবে পরিচিত। এখানকার জীবাশ্মগুলো বহু প্রাচীন প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণ করে রেখেছে।
নতুন আবিষ্কৃত পেঁচার জীবাশ্মটি গবেষকদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে শুধু কঙ্কাল নয়, পাখিটির শেষ খাবারের চিহ্নও পাওয়া গেছে। সাধারণত এত দীর্ঘ সময় পর কোনো প্রাণীর পাকস্থলীর ভেতরের খাবারের অবশেষ অক্ষত অবস্থায় পাওয়া অত্যন্ত বিরল।
গবেষকেরা বলছেন, এই আবিষ্কার পেঁচার বিবর্তনের ইতিহাস সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে। একই সঙ্গে প্রাচীন প্রাণীদের খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বোঝার জন্যও জীবাশ্মটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একটি প্রাচীন পেঁচার পেটের ভেতরে পাওয়া তেলাপকার অবশেষ হয়তো কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীর এক হারিয়ে যাওয়া দিনের গল্পই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
সূত্র: Senckenberg Museum of Natural History Görlitz-এর গবেষণা সংবাদ, ৩ নভেম্বর ২০২৬; Current Biology জার্নাল। মূল গবেষণা সংবাদ

















