আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৮ বছরে ৫০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি, ৩০টি দেশ ঘুরে ৫৭ বছর বয়সে ফিরলেন মায়ের কাছে
নিজস্ব প্রতিবেদক, আন্তর্জাতিক: একদিন ঘর ছেড়েছিলেন পৃথিবী ঘুরে হেঁটে আবার মায়ের কাছে ফিরবেন বলে। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ ২৮ বছর। জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় ধরে চলা এক দুঃসাহসিক অভিযান শেষে অবশেষে মায়ের কাছে ফিরেছেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী কার্ল বুশবি।
গত ২ নভেম্বর ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় শহর হালে (Hull) নিজের বাড়িতে পৌঁছান তিনি। ১৯৯৮ সালে যে বাড়ি ছেড়ে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল, দীর্ঘ ২৮ বছর পর সেই বাড়িতেই ফিরে মাকে জড়িয়ে ধরেন ৫৭ বছর বয়সী এই অভিযাত্রী। ছেলেকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তাঁর মা অ্যাঞ্জেলা বুশবি।

১৯৯৮ সালের ১ নভেম্বর দক্ষিণ আমেরিকার চিলির পুন্তা আরেনাস থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন কার্ল। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৯ বছর। লক্ষ্য ছিল চার মহাদেশ ও ৩০টি দেশ পেরিয়ে প্রায় ৫০ হাজার কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরা।
এই অভিযানের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল তাঁর নিজের তৈরি করা দুটি কঠিন নিয়ম। কোনো যানবাহন ব্যবহার করে সামনে এগোনো যাবে না এবং বাড়ি ফিরতে হবে সম্পূর্ণ নিজের পায়ে হেঁটে। সমুদ্র বা জলপথ পার হওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি নৌযান বা বিমানের সাহায্য নিতে চাননি।
পথে তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছে ভয়াবহ সব বিপদের। দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার দুর্গম জঙ্গল, মরুভূমি, হিমশীতল অঞ্চল এবং বিপজ্জনক সীমান্ত অতিক্রম করতে হয়েছে। ২০০১ সালে পানামার সীমান্তবর্তী নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের অভিযোগে ১৮ দিন কারাগারেও থাকতে হয়েছিল তাঁকে।
২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যবর্তী বেরিং প্রণালি অতিক্রম করার সময় বরফের বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়েন তিনি। বরফের চাঁই ভেঙে যাওয়ায় প্রাণহানির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। পরে উদ্ধার করা হলেও রাশিয়ায় অবৈধভাবে প্রবেশের অভিযোগে তাঁকে আবারও আটক হতে হয়।
রাশিয়া অতিক্রম করতে তাঁর প্রায় ১০ বছর লেগে যায়। ভিসা জটিলতা, আবহাওয়া এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তসংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে বারবার অভিযান বন্ধ রাখতে হয়েছে। ২০১২ সালে রাশিয়ার ভিসা না পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ওয়াশিংটনে রুশ দূতাবাস পর্যন্ত হেঁটে প্রতিবাদ জানান তিনি। পরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়ার পথ তৈরি হয়।
শুধু স্থলপথ নয়, নিজের নিয়ম রক্ষা করতে তাঁকে সাঁতার কেটেও জলপথ পাড়ি দিতে হয়েছে। কাস্পিয়ান সাগর ও ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রমের অভিজ্ঞতা ছিল বিশেষভাবে কঠিন। কাস্পিয়ান সাগর পার হতে ৩১ দিন সময় লেগেছিল তাঁর। সাঁতারে খুব একটা দক্ষ না হওয়ায় বিশেষ ভাসমান পোশাক ও সরঞ্জামের সহায়তা নিতে হয়েছিল।
অর্থসংকট, স্পনসর হারানো, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা এবং করোনাভাইরাস মহামারিও তাঁর যাত্রাকে দীর্ঘায়িত করে। কখনো কয়েক মাস, কখনো কয়েক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে পরবর্তী যাত্রা শুরুর জন্য।
এই দীর্ঘ সময়ে পরিবারের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয়। মায়ের সঙ্গে প্রায় এক দশক দেখা হয়নি তাঁর। যাত্রাপথে কয়েকবার দেখা হয়েছে ছেলে অ্যাডামের সঙ্গে। দেশে ফিরে প্রথমবারের মতো ১২ বছর বয়সী নাতনির সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান তিনি।

হালে পৌঁছে শত শত মানুষ তাঁকে স্বাগত জানান। শহরের কেন্দ্রস্থলে সংবর্ধনা শেষে মায়ের বাড়ির সামনে পৌঁছালে তৈরি হয় আবেগঘন দৃশ্য। মাকে জড়িয়ে ধরে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটান কার্ল।
তিনি বলেন, এই যাত্রা শুধু তাঁর একার ছিল না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অসংখ্য মানুষের সহযোগিতা, ভালোবাসা ও আতিথেয়তা তাঁকে লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের কাছ থেকেও তিনি যে আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছেন, তা তাঁর জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি।
দীর্ঘ অভিযানের পর এখন কী করবেন, তা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন কার্ল। তবে তাঁর জীবন ও অভিযান নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি নিজের স্মৃতিকথার পরবর্তী বই প্রকাশের পরিকল্পনাও রয়েছে।
২৮ বছর আগে যে মানুষটি বাড়ি ছেড়েছিলেন, তিনি ফিরেছেন সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া এক মানুষ হিসেবে। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ অভিযানের শেষ দৃশ্যটি ছিল সবচেয়ে পরিচিত—মায়ের বাড়ি এবং মায়ের আলিঙ্গন।
সূত্র: Associated Press (AP), ২ নভেম্বর ২০২৬; ABC News। AP

















