১৯৪ বছরের এই জোনাথন কচ্ছপের শরীরেই কি লুকিয়ে আছে দীর্ঘায়ুর রহস্য?মানুষের কয়েকটি প্রজন্ম পার হয়ে গেছে, এখনো বেঁচে আছে জোনাথন; তার জিন বিশ্লেষণ করছেন বিজ্ঞানীরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পৃথিবীতে মানুষের গড় আয়ু যেখানে ৭০ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে, সেখানে একটি কচ্ছপের বয়স প্রায় ১৯৪ বছর! নাম তার জোনাথন। দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের প্রত্যন্ত দ্বীপ সেন্ট হেলেনায় বসবাসকারী এই বিশাল কচ্ছপকে পৃথিবীর সবচেয়ে বয়স্ক জীবিত স্থলপ্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিজ্ঞানীরা এখন জোনাথনের শরীর ও জিন বিশ্লেষণ করে দীর্ঘায়ুর রহস্য খুঁজছেন। তাঁদের আগ্রহ, কীভাবে একটি প্রাণী প্রায় দুই শতাব্দী ধরে বেঁচে থাকতে পারে এবং বয়স বাড়ার পরও তার শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কোষীয় কার্যক্রম কীভাবে সচল থাকে।
জোনাথন একটি আলডাবরা জায়ান্ট কচ্ছপ। ধারণা করা হয়, ১৮৩২ সালের দিকে তার জন্ম। তবে সঠিক জন্মতারিখ জানা নেই। ১৮৮২ সালে তাকে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নিয়ে আসা হয়। সে সময় তাকে প্রাপ্তবয়স্ক প্রাণী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। সেই হিসাব থেকেই তার বয়স প্রায় ১৯৪ বছর বলে অনুমান করা হয়।
বর্তমানে সে সেন্ট হেলেনার গভর্নরের সরকারি বাসভবন প্ল্যানটেশন হাউসের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসবাস করে। দীর্ঘদিন ধরে দ্বীপটির বাসিন্দা ও পর্যটকদের কাছে সে পরিচিত মুখ।
আলডাবরা প্রজাতির কচ্ছপ সাধারণত ১০০ বছরেরও বেশি বাঁচতে পারে। কিন্তু জোনাথনের বয়স সেই স্বাভাবিক সীমাকেও অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। গবেষকদের মতে, তার বয়সের পক্ষে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক নথি ও ছবি রয়েছে, যা তাকে বিশেষভাবে নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করতে সাহায্য করেছে।
জোনাথনের দীর্ঘায়ুর কারণ অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরা তার জিনোম ও এপিজিনোম বিশ্লেষণ করেছেন। জিনোম হলো কোনো জীবের সম্পূর্ণ জিনগত তথ্য। অন্যদিকে এপিজিনোম হলো এমন কিছু রাসায়নিক চিহ্ন, যা জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
গবেষণায় ডিএনএ মেরামত, কোষের শক্তি উৎপাদন, ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণ এবং টেলোমিয়ারের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনগত বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে।
টেলোমিয়ার হলো ক্রোমোজোমের দুই প্রান্তে থাকা সুরক্ষামূলক অংশ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোষ বিভাজনের প্রক্রিয়ায় এগুলোর পরিবর্তন ঘটে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, জোনাথনের শরীরে এসব প্রক্রিয়া তুলনামূলক কার্যকর থাকার বিষয়টি তার দীর্ঘায়ুর একটি কারণ হতে পারে।
এছাড়া কোষের শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যক্রম নিয়েও গবেষণা চলছে। বয়স বাড়লেও কোষের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা কীভাবে সচল থাকে, সেটি বোঝার চেষ্টা করছেন গবেষকেরা।
তবে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না যে শুধু একটি বা দুটি জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই জোনাথন এত দীর্ঘদিন বেঁচে আছে। তার দীর্ঘায়ুর পেছনে একাধিক জৈবিক বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশগত কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
জোনাথনের জীবন তাই শুধু প্রাণীজগতের একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। মানুষের বার্ধক্য, কোষের ক্ষয় এবং দীর্ঘায়ু সম্পর্কে নতুন গবেষণার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস বুকে নিয়ে বেঁচে থাকা এই কচ্ছপ এখন বিজ্ঞানীদের কাছে যেন জীবন্ত গবেষণাগার।
সূত্র: Reuters, ৭ অক্টোবর ২০২৬; গবেষণাপত্র Science Advances। Reuters-এর প্রতিবেদন প্রকাশিত Dawn।
















