
গ্রাফটিং টমেটোর গাছ। ছবি: দেশবাংলা২৪
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে টমেটোর গ্রাফটিং চারা উৎপাদন ঘিরে গড়ে উঠেছে সম্ভাবনাময় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নার্সারিতে উৎপাদিত এসব চারা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। রোগবালাই সহনশীলতা, শক্তিশালী শিকড় ও তুলনামূলক বেশি ফলনের সম্ভাবনার কারণে কৃষকদের কাছে বাড়ছে এ চারার কদর। একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান, বাড়ছে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কমলগঞ্জে প্রতি মৌসুমে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ গ্রাফটিং টমেটোর চারা উৎপাদিত হয়। প্রতিটি চারা ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এসব চারা উৎপাদন ও বিপণনকে কেন্দ্র করে এক মৌসুমে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে।
উপজেলার আদমপুর, জালালপুর, বনগাঁও, কান্দিগাঁও, মধ্যগাঁও ও নাজাতকোনাসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে গ্রাফটিং চারা তৈরির নার্সারি। এসব নার্সারিতে কর্মব্যস্ত সময় পার করছেন উদ্যোক্তা ও শ্রমিকেরা। মৌসুম শুরুর আগেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকেরা চারা সংগ্রহের জন্য অগ্রিম অর্ডার দিচ্ছেন। চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো চারা সরবরাহ করতে অনেক উদ্যোক্তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
যেভাবে তৈরি হয় গ্রাফটিং চারা
গ্রাফটিং পদ্ধতিতে তিতবেগুন বা বনবেগুনের শক্তিশালী শিকড়যুক্ত অংশের সঙ্গে টমেটো গাছের ওপরের অংশ জোড়া লাগানো হয়। প্রথমে আলাদা বীজতলায় দুই ধরনের চারা তৈরি করা হয়। তিতবেগুনের চারা উপযুক্ত হতে প্রায় ৩৫ দিন এবং টমেটোর চারা তৈরি হতে প্রায় ২৫ দিন সময় লাগে। পরে সুস্থ ও উপযুক্ত চারার নির্দিষ্ট অংশ নিখুঁতভাবে কেটে জোড়া লাগিয়ে বিশেষ পরিচর্যায় রাখা হয়।
জোড়ার স্থান পলিথিন বা বিশেষ ক্লিপ দিয়ে আটকে রাখা হয়। সাধারণত তিন থেকে ছয় দিনের মধ্যে দুই অংশের সংযোগ তৈরি হয়। এরপর আরও ১০ থেকে ১২ দিন পরিচর্যার ঘরে রেখে চারাগুলো বিক্রির উপযোগী করা হয়।
স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, বনবেগুনের শক্তিশালী শিকড়ের কারণে গ্রাফটিং পদ্ধতিতে তৈরি টমেটোগাছ তুলনামূলক শক্তিশালী হয়। কিছু রোগ ও প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলায়ও এসব গাছের সক্ষমতা বেশি হতে পারে। ফলে সাধারণ চারার তুলনায় গ্রাফটিং চারার প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
একজন শ্রমিক দিনে তৈরি করেন ১২০০ চারা
গ্রাফটিং চারা উৎপাদন স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, একজন দক্ষ শ্রমিক দিনে প্রায় এক হাজার থেকে ১ হাজার ২০০টি পর্যন্ত চারা জোড়া লাগাতে পারেন। প্রতিটি চারার গ্রাফটিংয়ের কাজের জন্য শ্রমিকেরা পারিশ্রমিক পান। ফলে তুলনামূলক স্বল্প পরিসরের জায়গা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে অনেকে এই পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
স্থানীয় উদ্যোক্তা এম এ করিম জানান, শুরুতে এলাকায় গ্রাফটিং চারা উৎপাদনের কাজ খুব বেশি পরিচিত ছিল না। ধীরে ধীরে এর সম্ভাবনা দেখে অন্য কৃষকেরাও এ উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন। এখন কমলগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় নার্সারিতে বাণিজ্যিকভাবে চারা উৎপাদন হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষকেরা এসে এসব চারা সংগ্রহ করছেন।
কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. রাকিবুল ইসলাম জানান, উপজেলায় প্রতি মৌসুমে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ গ্রাফটিং টমেটোর চারা উৎপাদিত হচ্ছে। এসব চারা মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করা হয়। এ খাতকে কেন্দ্র করে প্রতি মৌসুমে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে আরও জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ হয়েছে। এ চাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ৪৮০ জন কৃষক।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, মানসম্মত চারা উৎপাদন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে কমলগঞ্জের গ্রাফটিং টমেটোর চারা শিল্প আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের সবজি উৎপাদনেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

















