সাজু মারচিং
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান থেকে মাধবপুর লেক, পাহাড়ি চা-বাগানের সবুজ গালিচা থেকে শুরু করে দুর্গাপূজার টানা ছুটিতে পর্যটকদের মুখর পদচারণায় জমে উঠেছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ। প্রকৃতির টানে ছুটে আসা হাজারো মানুষের ভিড়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে চায়ের রাজধানীতে।
শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের পাহাড়ঘেরা বন, চা-বাগান, লেক, জলপ্রপাত আর শারদীয় দুর্গোৎসবের সাপ্তাহিক ছুটিসহ টানা পাঁচ দিনের ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হয়ে ওঠে এ দুই উপজেলা। গত পাঁচ দিন ধরেই লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেকসহ আশেপাশের রিসোর্টগুলোতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। বুধবার বিজয়া দশমীর দিনেও উদ্যানে প্রবেশের মুখে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।
পর্যটন জেলা মৌলভীবাজারে প্রতি বছর বিভিন্ন ছুটিতে দেশি-বিদেশি ও স্থানীয় পর্যটকসহ হাজারো পর্যটক আসেন। এবারেও পূজার ছুটিতে পর্যটক এসেছেন। জেলার সাতটি উপজেলায় কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক ছোট-বড় মিলে প্রায় শতাধিক পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। এসব দর্শনীয় স্থান দেখতে পরিবার- পরিজন নিয়ে ভিড় করছেন। এর পাশাপাশি প্রায় দুই শতাধিক রিসোর্ট রয়েছে। এসব দৃষ্টিনন্দন বেশিরভাগ রিসোর্ট শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে অবস্থিত। এগুলো দেখতেও পর্যটকের মধ্যে উৎসাহের কমতি নেই।

সরজমিনে মঙ্গলবার, বুধবার ও বৃহস্পতিবার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ঘুরে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার পর্যটক এসেছেন এই উদ্যান ঘুরতে। এছাড়াও জেলার বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। কেউ প্রাইভেট গাড়ি নিয়ে আবার কেউ দলবেঁধে মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তবে শ্রীমঙ্গল শহরে সবসময় তীব্র যানযট লেগে থাকায় পর্যটকদের কিছুটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
জেলার উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্রর অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি কমপ্লেক্স, হামহাম জলপ্রপাত, বাইক্কা বিল, চা- কন্যা ভাস্কর্য, বধ্যভূমি, ডিনস্টন সিমেট্রি, মনিপুরী পল্লী, হাকালুকি হাওড়, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত
মনু ব্যারেজ, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনষ্টিটিউট, উঁচু নিচু সবুজ চা বাগান,নীলকন্ঠ টি কেবিন, ব্যক্তি মালিকানা সীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা। এসব কেন্দ্রে পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদুল আজহার পর দীর্ঘ ৪ মাস পর আবার পর্যটকের আগমন ঘটেছে পূজার এই ছুটিতে জেলায়। জেলায় অন্তত ১০ হাজার পরিবার পর্যটন ব্যবসার উপর নির্বরশীল। পর্যটন ব্যবসা ভালো না হলে এসব পরিবারের মানুষ কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করতে হয়। কমবেশি পর্যটক এবার এসেছেন। পর্যটকেরা তাদের চাহিদা মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, অনুকূল আবহাওয়া ও দেশের স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভ্রমণপ্রেমীদের উৎসাহিত করছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটি কাটাতে অনেকে বেছে নিচ্ছেন মৌলভীবাজারকে। ফলে এবারের পূজার ছুটি জেলার পর্যটন খাতের জন্য অন্যতম ব্যস্ত সময় হিসেবে বিবেচিত হবে।
গোপালগঞ্জ জেলা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আশা হাসান চৌধুরী বলেন, এক বছর পর আবার মৌলভীবাজারে এসেছি। এখানের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের প্রাকৃতিক দৃশ্য সত্যি অসাধারণ। তবে এখানে একটি পর্যটন কেন্দ্র থেকে অন্য পর্যটন কেন্দ্রে যাওয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই নাজুক।
চট্রগাম থেকে ঘুরতে আসা শ্রাবন্তি পাল বলেন, পূজার ছুটিতে বাচ্চাকে নিয়ে দুদিনে জন্য আমরা ঘুরতে এসেছি। বিশেষ করে এই অঞ্চলে আসলে একসাথে অনেক কিছু দেখা যায়। চা-বাগান, লাউয়াছড়া, হাওর, জলপ্রপাতসহ বেশকিছু জায়গা একদিনেই ঘুরে দেখা যায়। এখানে পর্যটনের ওপর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পর্যটনকে ঘিরে কাঙ্খিত কোন উন্নয়ন চোখে পড়েনি।
কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান প্রকৃতিপ্রেমীদের প্রধান আকর্ষণ। বনের বুক চিরে চলে যাওয়া সড়ক ও রেলপথের রূপ উপভোগ করতে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা।
একই ছবি দেখা গেছে মাধবপুর লেকেও। পাহাড় আর সবুজ চা-বাগানের মাঝের এই জলাশয়ে হাজারো পর্যটকের উপস্থিতি ও ছবি তোলার আনন্দ উপভোগ করছেন। এ ছাড়াও ক্যামেলিয়া লেক, হামহাম জলপ্রপাত এবং সীমান্তসংলগ্ন চা-বাগানগুলোতে ছিল উপচেপড়া ভিড়।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমেদ বলেন, লম্বা ছুটি হলে মৌলভীবাজারে পর্যটকের ব্যাপক আগমন ঘটে। এবারের ছুটিতেও বিপুলসংখ্যক পর্যটক এসেছেন। আমরা যতটুকু আশা করেছিলাম ততটুকু পর্যটক এসেছেন। রেল ও সড়কপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে আরও পর্যটক আসতেন।
মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘টানা ছুটিতে পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে, নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে মৌলভীবাজারের পর্যটনকেন্দ্রে সময় কাটাতে পারেন, সে জন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সুপার জানান, গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশি কার্যক্রম ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল ও প্রয়োজনীয় তদারকি চলছে। কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে পুলিশ সতর্ক।
















