
কাজী গোলাম কিবরিয়া, শ্রীমঙ্গল
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় জনবল ও কারিগরি কর্মীর সংকটে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। রেডিওগ্রাফার, সনোলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট ও কার্ডিওগ্রাফার না থাকায় এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজি মেশিন থাকলেও সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। একই সঙ্গে গাইনি, অ্যানেসথেসিয়া, ফিজিক্যাল মেডিসিনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে চিকিৎসক সংকট রয়েছে।
৫০ শয্যার এই হাসপাতালে ২২০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৫৩ জন। শূন্য রয়েছে ৬৭টি পদ। ১২টি জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। ২৯টি মেডিকেল অফিসার ও সহকারী সার্জনের পদের বিপরীতে আছেন ১২ জন। ১২টি স্যাকমো পদের মধ্যে কর্মরত সাতজন। তবে ৩৩টি নার্সের পদ পূর্ণ রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ রোগী এবং জরুরি বিভাগে ১২০ থেকে ১৪০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। ভর্তি থাকেন গড়ে ৫৫ থেকে ৬৫ জন। রোববার সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ৫০ শয্যার হাসপাতালে ৫৬ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। অতিরিক্ত রোগীদের বারান্দায় অতিরিক্ত বেড ও ফ্লোরিং করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
কারিগরি জনবল না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এক্স-রে মেশিন অকেজো পড়ে আছে। সনোলজিস্ট না থাকায় আলট্রাসনোগ্রাম এবং টেকনিশিয়ান সংকটে ইসিজি সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে এসব পরীক্ষা করাতে রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা শহরের বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে।
হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মুমূর্ষু রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ট্রলিও নেই। ব্লাড ব্যাংক না থাকায় জরুরি প্রয়োজনে বাইরে থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে হয়। প্রয়োজনের তুলনায় ওষুধও অপ্রতুল বলে অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম সচল রাখার ক্ষেত্রেও আইপিএসের ব্যাটারি ও জেনারেটরের জ্বালানি সংকট রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০১২ সালে ৩১ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়েই ৫০ শয্যার কার্যক্রম চালু করা হয়। এরপর দীর্ঘ ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও ৫০ শয্যার উপযোগী নতুন জনবল কাঠামো তৈরি হয়নি।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মাসুম বলেন, তাঁর স্ত্রী ছয় মাসের গর্ভবতী। গাইনি চিকিৎসক না থাকায় তাঁকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে হবে। এতে দরিদ্র রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
আরেক রোগীর স্বজন জলি আক্তার বলেন, রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে অসুস্থ রোগীদের আরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডের ইনচার্জ হাসিনা আক্তার বলেন, প্রতিদিনই গর্ভবতী নারীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। গাইনি চিকিৎসক না থাকায় জটিল রোগীদের অন্যত্র পাঠাতে হয়। চলতি মাসে প্রায় ১৫০টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অভিজিৎ বনিক বলেন, জনবল সংকটের কারণে তাঁকে একাই রক্ত সংগ্রহ, নমুনা প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরীক্ষা ও রিপোর্ট দেওয়ার কাজ করতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত জনবল থাকলে সেবার মান আরও ভালো হতো।
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বিশ্বজিৎ রায় বলেন, প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক শিশু রোগী আসছে। চিকিৎসক সংখ্যা কম হওয়ায় রোগীদের চাপ সামলাতে সমস্যা হচ্ছে।
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রহমান বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর জনবল সংকট সমাধানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আগামী বছরের মধ্যে সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছেন তিনি।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, বিষয়টি ইতোমধ্যে অবগত হয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি জানিয়েছেন। দ্রুত সংকটের সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন, প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় হাসপাতাল পরিচালনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা গাইনি ও অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক না থাকা। এ কারণে প্রসূতি মায়েদের সেবা দিতে সমস্যা হচ্ছে।
তিনি বলেন, হাসপাতালে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন থাকলেও এগুলো পরিচালনার লোক নেই। প্রতিদিন ৫৫ থেকে ৬৫ জন রোগী ভর্তি থাকেন। অতিরিক্ত রোগীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মাত্র দুজন ক্লিনার দিয়ে এত বড় হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো কঠিন।
ডা. সিনথিয়া তাসমিন আরও বলেন, সংকটের মধ্যেও হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল পেলে রোগীদের আরও ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। জনবল চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও এখনো প্রয়োজনীয় লোকবল পাওয়া যায়নি।
















