
দরজায় কড়া নাড়ছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। এরই মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীরা অবস্থান জানান দিতে শুরু করেছেন। দোয়া চেয়ে বা জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তৈরি ব্যানার পোস্টার দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। জনসংযোগ মতবিনিময় করছেন অনেক প্রার্থীরা।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৯ ইউনিয়নের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ৩নং সদর ইউনিয়নের প্রার্থীরা বসে নেই। বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত বৈঠকে জানুয়ারি মাস থেকে দেশে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় বলে জানানো হয়েছে। কয়েক ধাপে এ নির্বাচনের ঘোষণা আসার পরপরই প্রার্থীরা নড়েচড়ে বসেছেন।
শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. সাইফুর রহমান শিপু। দীর্ঘ দিন ধরে তিনি জনসংযোগ চালিয়ে আসছেন। সম্প্রতি দেশবাংলা২৪ এর সাথে এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রদান করেন।
সাক্ষাৎকারে তার নির্বাচনী এলাকা, উন্নয়ন, রাস্তা ঘাট, অবকাঠামো, মাদক, পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুশাসন নিয়ে নানা প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।
নিচে পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো:
দেশবাংলা: আসসালামু আলাইকুম! কেমন আছেন?
শিপু: আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন?
দেশবাংলা: বর্তমান সরকার দলীয় ছাত্ররাজনীতিতে জড়িত আছেন। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত কেন?
শিপু: আমি এই ইউনিয়নের সন্তান। এই মাটিতে বড় হয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, আমাদের ৩নং ইউনিয়নে সম্ভাবনা অনেক কিন্তু সেবাটা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না। মানুষের ভালোবাসা ও তাগিদ থেকেই দায়িত্ব নিতে চাওয়া। চেয়ারম্যান পদ আমার কাছে ক্ষমতা নয়, সেবার সুযোগ।
দেশবাংলা: এবারের নির্বাচনে আরো অনেক প্রার্থীর অংশ নিতে যাচ্ছেন। সে দিক থেকে ভোটাররা আপনাকে কেন ভোট দেবে?
শিপু: প্রথমত, আমি এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী – সবসময় পাশে ছিলাম। দ্বিতীয়ত, আমি তরুণ ও উদ্যমী, নতুন চিন্তা নিয়ে কাজ করতে চাই। তৃতীয়ত, আমার মধ্যে স্বচ্ছতা আছে, আমি কারো কাছে দায়বদ্ধ নই, শুধু জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে চাই। তাছাড়া আমি ছাত্রজীবন থেকে সামাজিক সংগঠন, ক্রীড়াসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবামুলক কাজের সাথে যুক্ত। মানুষকে সংগঠিত করা, তাদের সমস্যা শোনা এবং প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে সমাধান করার আমার লব্ধ অভিজ্ঞতাকে মানুষেরে কল্যানে চেয়ারম্যান হিসেবে সবচেয়ে বেশি কাজে আসবে।
দেশবাংলা: প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাও অনেক যোগ্য।
শিপু- দেখুন আমি কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করি না, সবাই আমার সম্মানিত ও যোগ্য। তবে আমার বিশেষত্ব হলো আমি প্রতিশ্রুতি কম দিই, কাজ বেশি করতে চাই। আমি কোনো ঠিকাদার বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রার্থী নই, আমি সাধারণ মানুষের প্রার্থী। আমার দরজা সবার জন্য খোলা থাকবে।
দেশবাংলা: সদর ইউনিয়ন বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত। গ্রামীণ রাস্তাঘাট ও কালভার্টের বেহাল দশা, জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশন সমস্যা।নাগরিক সেবা যেমন জন্মনিবন্ধন, অনুদান, ভিজিএফ এর চাল বিতরনে অনিয়ম, ইত্যাদি খাতে ইউনিয়ন অফিসে নাগরিক হয়রানি নৈমিত্তিক বিষয়…
শিপু- বিগত সরকারের আমলে এই ইউনিয়ন দলীয় প্রভাবে নানা অনিয়ম দুর্নীতি হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের শুপারিশ ছাড়া সেবা পাওয়া সুযোগ ছিল না। সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন বলেন, ভাতা, ভিজিএফ, বা সামাজিক সুরক্ষায় প্রকল্পে দলীয়করণ অনিয়ম হয়েছে। টাকা ছাড়া কোন সার্টিফিকেট পাওয়া যেতো না- এখন সময় মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে। যিনিই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হেন না কেন, সদর ইউনিয়নের সুশাসন ফেরানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশবাংলা – কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে বালু সিন্ডিকেটে জড়িত থাকার কথা শোনা যায়…
শিপু- এটা সম্পুর্ন মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ। অবৈধ বালু সিন্ডিকেটের সাথে আমার দুরতম কোন সম্পর্ক নেই।
দেশবাংলা : নির্বাচিত হলে এলাকায় মাদক ও কিশোর অপরাধের বিস্তার রোধে আপনার পরিকল্পনা?
শিপু- খুব ভালো কথা বলেছেন। দেখুন সবার শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করাটা জরুরি। পাশাপাশি এলাকার যুব- কিশোরদের খেলাধুলায় ফেরানো। এতে করে মাদকের ব্যপকতা, সামাজিক অপরাধবোধগুলো একেবারে নির্মুল করা সম্ভব না হলেও ব্যাপকতা ঠেকানো সম্ভব। কিশোর অপরাধ রোধে পুলিশ, শিক্ষক, অভিভাবকদের নিয়ে প্রতিরোধ কমিটি করবো। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়িয়ে তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করবো।
দেশবাংলা: সদর ইউনিয়ন শ্রীমঙ্গল টাউনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে গঠিত। ফলে এই জনগুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নের, ছড়া, পরিবেশ দূষণ, রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ড্রেনেজ বর্জ্য ব্যাবস্থাপনা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন?
শিপু-সত্যি বলতে বর্তমান অবস্থা সন্তোষজনক নয়। অনেক রাস্তা আছে যেগুলো একটু বৃষ্টিতেই চলাচলের অযোগ্য হয়ে যায়। অনেক কালভার্ট ভেঙে গেছে। আমি মনে করি অতিতে অপরিকল্পিত উন্নয়ন হয়েছে। আমার পরিকল্পনা- ওয়ার্ড ভিত্তিক তালিকা করে সবচেয়ে জরুরি রাস্তাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ইউনিয়নের প্রধান সমস্যা খাল ও ছড়া ভরাট হয়ে যাওয়া। নির্বাচিত হলে প্রথম কাজ হবে ইউনিয়নের সব খাল- ছড়া খনন করা।
শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই আমাদের সম্পদ। প্রকৃতি পরিবেশ সুরক্ষা, ছড়া, জলাশয় উন্নয়ন, টিলা কাটা বন্ধে আমি জিরো টলারেন্স নীতি নেবো। পরিবেশ রক্ষায় সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি হাতে নেবো।
দেশবাংলা: পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতি নিয়ে আপনার ভাবনার কথা….
শিপু-শ্রীমঙ্গল চা ও পর্যটনের রাজধানী। আমাদের ইউনিয়নে অনেক সুন্দর জায়গা আছে। পর্যটক আকর্ষণে আমি পর্যটন স্পটগুলোর রাস্তা উন্নয়ন করবো। দৃষ্টি নন্দন সড়ক বাতি, ফুটপাথ সম্প্রসারণ, দখলমুক্ত ও যানজট নিরসনে বাইপাস সড়ক প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে কাজ করতে চাই। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে চা, আনারস, লেবুর বাজারজাতকরণের জন্য সমবায় গঠন করতে চাই। এছাড়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা কৃষকরা যাতে ঠিকঠাক ভর্তুকি, বীজ, সার পায়, তার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে একটি কৃষি হেল্প ডেস্ক করবো। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ পেতে সহযোগিতা করবো।
দেশবাংলা: নাগরিক সেবা কিভাবে নিশ্চিত করতে চান, এনিয়ে কোন পরিকল্পনা?
শিপু- এটা আমার প্রথম অঙ্গীকার। জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ, নাগরিক সনদের জন্য মানুষকে দিনের পর দিন ঘুরতে হবে না। ৩ দিনের মধ্যে সেবা নিশ্চিত করবো। ইউনিয়ন পরিষদে একটি ওয়ান স্টপ ডিজিটাল সার্ভিস সেন্টার করবো, স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে যেখানে সেবার ফি প্রকাশ্যে টানানো থাকবে।
প্রতিটি প্রকল্পের বাজেট, বরাদ্দ ও ব্যয় ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশ বোর্ড ও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ওয়ার্ড কমিটির মাধ্যমে তদারকি হবে। আমি নিজে কোনো প্রকল্পের ঠিকাদার হবো না।
দেশবাংলা: আপনি ক্ষমতাসীন দল বিএনপির একজন নেতা। নির্বাচিত হলে পরিষদে স্বজনপ্রীতি ও দলীয় প্রভাব মোকাবিলা করবেন কিভাবে?
শিপু-আমার কাছে দল নয়, ইউনিয়নবাসী বড়। চেয়ারম্যান হলে আমি সবার চেয়ারম্যান। কোনো ওয়ার্ড বা দল দেখে কাজ বণ্টন হবে না, প্রয়োজনীয়তা দেখে হবে। ভাতার তালিকা হবে উন্মুক্ত ও যাচাই- বাছাইকৃত। প্রকৃত অসহায় ব্যক্তি যাতে বাদ না পড়ে এবং কোনো ধনী বা অযোগ্য ব্যক্তি যাতে না পায়, তা নিশ্চিত করতে ওয়ার্ড সভায় তালিকা ঘোষণা করা হবে। এজন্য দলীয় তদবির বা সিদ্ধান্ত বিবেচনায় নেয়া হবে না।
দেশবাংলা: উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অর্থায়ন কীভাবে?
শিপু- ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব আয়, সরকারি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP), এলজিএসপি প্রকল্প, এবং উপজেলা ও জেলা পরিষদের বরাদ্দ থেকেই বেশিরভাগ কাজ সম্ভব। আমি বরাদ্দ আনার জন্য দৌড়ঝাঁপ করবো, ঘরে বসে থাকবো না।
দেশবাংলা: গণশুনানি করবেন?
শিপু- হ্যাঁ, প্রতি ৬ মাস পর পর ইউনিয়ন পরিষদে গণশুনানি করবো। যে কেউ সরাসরি এসে অভিযোগ জানাতে পারবে।
দেশবাংলা: নির্বাচিত হলে আপনার বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তদন্তে নিজেকে উন্মুক্ত রাখবেন?
শিপু- শতভাগ। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আমি নিজেই তদন্তের আহ্বান জানাবো। কারণ আমি বিশ্বাস করি, স্বচ্ছ থাকলে ভয়ের কিছু নেই।
দেশবাংলা : এই সময়ে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ বা বিতর্ক?
শিপু- আমার জানামতে আমার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি বা অনৈতিক কাজের অভিযোগ নেই। আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী। রাজনীতি করতে গেলে টুকটাক কথা হয়, কিন্তু আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি কেউ প্রমাণ দেখাতে পারবে না যে আমি কারো ক্ষতি করেছি।
দেশবাংলা: ভোটে পরাজিত হলে?
শিপু- আমি আপনাকে শুরুতে বলেছি, আমি এই ইউনিয়নের সন্তান। নির্বাচন একদিনের, কিন্তু ইউনিয়ন আমার চিরদিনের। হেরে গেলেও মানুষের পাশে থাকবো, কারণ আমি জনপ্রতিনিধি হতে চাই ভোটের জন্য নয়, দায়িত্ববোধ থেকে।
দেশবাংলা : আপনার ইউনিয়নের ভোটারদের উদ্দেশ্য কিছু বলবেন? (সংক্ষেপে)
শিপু- প্রিয় ৩ নং ইউনিয়নবাসী, আমি আপনাদেরই সন্তান। আমি ক্ষমতা চাই না, আপনাদের সেবা করার সুযোগ চাই। একবার সুযোগ দিয়ে দেখুন, আপনাদের ইউনিয়নকে একটি মডেল, স্বচ্ছ ও মানবিক ইউনিয়ন হিসেবে গড়ে তুলবো। আপনাদের দোয়া, ভালোবাসা ও ভোট চাই।
দেশবাংলা: আমাদের আপনার মুল্যবান সময় দেয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
শিপু- আপনাকেও ধন্যবাদ।
[সাক্ষাৎকারগ্রহন : আবুজার বাবলা]
















