
শ্রীমঙ্গল বইপড়া উৎসব :২৬ প্রতিযোগিতায় স্কুল পরিদর্শনরত উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জিয়াউর রহমান। – দেশবাংলা২৪
স্টাফ রিপোর্টার
২৫ হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু। প্রথম ধাপ পেরিয়ে দ্বিতীয় ধাপে ১ হাজার ৯৫৭ জন। সেখান থেকে চূড়ান্ত পর্বে ৭৬০ জন। আর শেষ পর্যন্ত আটটি গ্রুপে বিজয়ী হবেন মাত্র ৮০ জন। পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসনের ব্যতিক্রমী ‘বইপড়া উৎসব-২০২৬’ এখন পৌঁছেছে চূড়ান্ত পরিণতিতে। আগামী ১০ অক্টোবর ফল প্রকাশ ও সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হবে প্রায় তিন মাসের এ পাঠযাত্রা।
শনিবার সকাল সাড় নয়টায় স্থানীয় জেলা পরিষদ হলরুমে উৎসবে সকল অংশগ্রহনকারীরা আলোচিত এই বই উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে মিলিত হবেন। মৌলভীবাজার ৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী অতিথি থেকে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া ও বিজয়ীদের মাঝে পুরষ্কার তুলে দেয়ার কথা রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন শ্রীমঙ্গলের বই পড়া উৎসব এর আয়োজক হলেও ব্যক্তিগত ভাবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জিয়াউর রহমানের বই পড়া উৎসব আয়োজনে মুল ভুমিকা পালন করেন। যা ব্যাপক মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
‘বই পড়ি, মন গড়ি’ স্লোগানে গত ২১ জুলাই শুরু হওয়া এ উৎসবে উপজেলার ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী যুক্ত হয়। পাঠ্যবইয়ের বাইরে সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, জীবনী ও বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই ছিল আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
আয়োজনটি তিনটি ধাপে ভাগ করা হয়—‘মুকুল’, ‘ফুল’ ও ‘ফল’। ১৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপ ‘মুকুল’-এ প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেয়। সেখান থেকে বাছাই করে ১ হাজার ৯৫৭ জনকে নেওয়া হয় দ্বিতীয় ধাপ ‘ফুল’-এ। ২ ও ৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এ পর্বের পর চূড়ান্ত ‘ফল’ পর্বের জন্য নির্বাচিত হন ৭৬০ জন। ১৯ সেপ্টেম্বর শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় তাদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন পরীক্ষা।
পরিসংখ্যানের হিসাবে, প্রথম ধাপের প্রায় ২৫ হাজার অংশগ্রহণকারীর মধ্যে দ্বিতীয় ধাপে জায়গা পেয়েছেন প্রায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। দ্বিতীয় ধাপের ১ হাজার ৯৫৭ জনের মধ্যে চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছেছেন প্রায় ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ। আর চূড়ান্ত ৭৬০ জনের মধ্য থেকে আটটি গ্রুপে পুরস্কৃত হবেন ৮০ জন—অর্থাৎ প্রায় ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হিসাব করলে ২৫ হাজারের বিপরীতে চূড়ান্ত বিজয়ীর সংখ্যা মাত্র ০ দশমিক ৩২ শতাংশের মতো।
তবে আয়োজকদের কাছে এই সংখ্যাই মূল সাফল্যের মাপকাঠি নয়। শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমানের ভাষায়, পুরস্কার পাবেন ৮০ জন; কিন্তু আয়োজনের সবচেয়ে বড় অর্জন হতে পারে সেই হাজারো শিক্ষার্থী, যারা বই হাতে নিয়েছে এবং বই পড়াকে অভ্যাসে পরিণত করার পথে এগিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এ উৎসবের ‘উন্মুক্ত বিভাগে’ শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যাংকার, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও অংশ নেন। এতে দেড় শতাধিক বইপ্রেমীর অংশগ্রহণের কথা জানিয়েছে আয়োজক সূত্র। ফলে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক আয়োজনটি ধীরে ধীরে একটি সামাজিক পাঠআন্দোলনের রূপ নেয়।
উৎসবের বিভিন্ন ধাপে বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য বই পড়ানো হয়। ‘মুকুল’ পর্বে ছিল এ. পি. জে. আবদুল কালামের উইংস অব ফায়ার, জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমেল ফার্ম, জুল ভার্নের অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেইজ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাশিয়ার চিঠি, সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যকসহ বিভিন্ন বই। পরবর্তী ধাপগুলোতেও রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, হুমায়ুন আজাদ, আল মাহমুদ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ও পাওলো কোয়েলহোর মতো দেশি-বিদেশি লেখকের বই রাখা হয়।
এদিকে ১০ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৯টায় জেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে ফল প্রকাশ ও সমাপনী অনুষ্ঠান। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে অডিটোরিয়াম প্রাঙ্গণের নির্ধারিত বুথে ‘Yes Card’ প্রদর্শন করে অংশগ্রহণকারীরা তাদের অংশগ্রহণের পুরস্কার ও সনদ সংগ্রহ করতে পারবেন। পরে মূল অনুষ্ঠানে আটটি গ্রুপের সেরা ১০ জন করে মোট ৮০ বিজয়ীর নাম ঘোষণা ও পুরস্কার প্রদান করা হবে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জিয়াউর রহমান জানান, শুরুতে লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়া। শেষ দিনে সেই উদ্যোগের সামনে এখন আরও বড় প্রশ্ন—২৫ হাজার হাতে যে বই পৌঁছেছিল, ১০ অক্টোবরের পর সেই বই কি তাদের জীবনের অভ্যাস হয়ে থাকবে? আমাদের প্রত্যাশা, প্রতিযোগিতা শেষ হলেও বই পড়ার এই যাত্রা যেন শেষ না হয়। শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসনও বই পড়াকে সাময়িক উৎসবের বাইরে একটি সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত করার প্রত্যয় জানিয়েছে।















