
নিজস্ব প্রতিবেদক
এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ধাক্কা সামলানোর আগেই এবার বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হলো তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি)। ফলে জ্বালানি ব্যয়ের চাপ এখন সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসার খরচে। আর এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে নতুন করে বাড়তে পারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম।
গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ৪ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। একই সঙ্গে অটোগ্যাসের দামও লিটারে ১১ টাকা ৫৩ পয়সা বাড়িয়ে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা করা হয়েছে।
বিইআরসির হিসাব বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির প্রধান কাঁচামাল প্রোপেন ও বিউটেনের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি জাহাজভাড়া ও আমদানিকারকদের প্রিমিয়ামও বেড়েছে। অক্টোবরের হিসাবের সময় প্রতি টন এলপিজির জন্য ফ্রেইট ও আমদানিকারকের প্রিমিয়াম ধরা হয়েছে ২৫০ ডলার, যেখানে সেপ্টেম্বরে তা ছিল ১৬০ ডলার।
কিন্তু সরকারি নির্ধারিত দামই যে বাস্তবে ভোক্তার শেষ দাম—তা নয়। সরবরাহ সংকট ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে অনেক জায়গায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ২৫০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ মূল্য সমন্বয়ের পরও সাধারণ মানুষকে নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ গুনতে হতে পারে।
বিশ্বের সংকট, দেশের ঘাড়ে চাপ
জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তা ও নৌ-পরিবহন ঝুঁকি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশের জন্য স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনার ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেটের এলএনজির জন্য প্রায় ৩০ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ পর্যন্ত দিতে হয়েছে, যা যুদ্ধের আগে প্রচলিত দামের প্রায় তিনগুণ।
কাতার থেকেও বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কাতারএনার্জি এশিয়ার কয়েকটি দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহেও বিঘ্নের কথা জানিয়েছে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি ব্যয় কোনো না কোনো পর্যায়ে দেশের বাজারেও প্রতিফলিত হওয়া স্বাভাবিক। প্রশ্ন হচ্ছে—এই বাড়তি ব্যয়ের পুরো ভার কি ভোক্তার ঘাড়েই চাপবে?
একটি মূল্যবৃদ্ধি, বহু খাতে অভিঘাত
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ির ভাড়া বাড়ে না। পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে, কৃষিতে সেচ ও যান্ত্রিক কাজে ব্যয় বাড়ে, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। সেই বাড়তি ব্যয় ধাপে ধাপে যুক্ত হয় পণ্যের মূল্যের সঙ্গে।
এলপিজির ক্ষেত্রে চাপটি আরও সরাসরি। দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবার রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। ফলে একটি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়ার অর্থ হলো—পরিবারের মাসিক বাজেটে সরাসরি নতুন ব্যয় যুক্ত হওয়া।
এর সঙ্গে যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ও বাড়ে, তাহলে শিল্প ও ব্যবসায় নতুন করে ব্যয়ের চাপ তৈরি হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন—তিন খাতে ব্যয় একসঙ্গে বাড়লে উৎপাদন খরচও বাড়বে। আর উৎপাদন খরচ বাড়লে শেষ পর্যন্ত তার বোঝা ভোক্তার কাঁধেই পড়বে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ক্রয়ক্ষমতায়
এখন মূল উদ্বেগ মূল্যবৃদ্ধি নয়, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কতটা টিকে থাকবে—সেটি। আয় যদি একই থাকে অথচ জ্বালানি, পরিবহন, খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়।
বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ প্রথমে খাদ্যতালিকা ছোট করবেন, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় কমানোর চেষ্টা করবেন, প্রয়োজনীয় কেনাকাটা পিছিয়ে দেবেন। মধ্যবিত্তও সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে বাধ্য হতে পারেন।
এমনিতেই বেকারত্ব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। তার ওপর জীবনযাত্রার ব্যয় যদি আরও দ্রুত বাড়ে, তাহলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপও বাড়বে।
বিশ্ববাজারের বাস্তবতা সরকারকে মূল্য সমন্বয়ে বাধ্য করতে পারে—এটি বাস্তবতা। কিন্তু সেই বাস্তবতার পাশাপাশি সরকারের দায়িত্বও কম নয়। আমদানি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা, কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারি বন্ধ, বাজার তদারকি জোরদার এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কার্যকর সহায়তা—সবই এখন জরুরি।
কারণ জ্বালানির দাম বাড়ার হিসাব শুধু পাম্পের মিটার কিংবা গ্যাস সিলিন্ডারের গায়ে লেখা দামে শেষ হয় না। এর প্রতিটি বাড়তি টাকা শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে মানুষের বাজারের ব্যাগ, রান্নাঘর এবং মাসের শেষের সংসার খরচে।

















