আবুজার বাবলা । শ্রীমঙ্গল
এক পাশে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও ঘনবসতি। অন্য পাশে বছরের পর বছর জমতে থাকা ময়লার স্তুপ।
প্রতিদিন প্রায় ১৫-২০ টন বর্জ্যরে দুর্গন্ধ, মশা-মাছি আর বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়ায় অতিষ্ঠ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
পৌরসভা প্রতিষ্ঠার প্রায় ৯০ বছর পার হলেও এখনো স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন হয়নি। ২০০২ সালে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাঙক্ষিত অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে শহরের কলেজ রোডের খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলায় আশপাশের এক থেকে দেড় কিলোমিটার এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
ভাগাড় সরানোর দাবিতে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের আন্দোলনও পুরোনো। বিভিন্ন সময় সরকারি কলেজ, বাডস্ রেসিডেনসিয়্যাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও গাউছিয়া শফিকিয়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী-শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকাবাসী ভাগাড় সরানোর দাবিতে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দিয়েছেন। ২০২৫ সালের জেলা প্রশাসকের আশ্বাসের পর আন্দোলন স্থগিতের কথা এবং পরে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর তথ্যও প্রকাশিত হয়। ফলে একই জায়গা নিয়ে আন্দোলন, প্রশাসনের আশ্বাস এবং পৌরসভার উদ্যোগ সবই চলছে বছরের পর বছর।
শ্রীমঙ্গল পৌরসভার তথ্যমতে, ১৯৯০-এর দশকে শহরের কলেজ রোডের এই ময়লার ভাগাড় সরানোর দাবিতে প্রায় এক দশক ধরে চলছে নানা উদ্যোগ, আন্দোলন ও প্রতিশ্রুতি। ভাগাড় সরাতে ২০১৭ সালে ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে সদর ইউনিয়নের জেটি রোডে ২ দশমিক ৪৩ একর জমি কিনে পৌরসভা। পরে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয়দের বিরোধিতা ও মামলা জটিলতায় প্রকল্পটি আটকে যায়। আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে জমিটি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়দের প্রশ্ন -শহরের পৌরসভার ময়লা কেন তাঁদের ইউনিয়নে ফেলা হবে? এনিয়ে গত ১৮ জুন উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শ্রীমঙ্গল কলেজ রোড ও উত্তর ভাড়াউড়া এলাকার নেতৃবৃন্দ, সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে বর্জ্য স্থানান্তর এবং আধুনিক রিসাইক্লিং প্লান্ট স্থাপন নিয়ে মতবিনিময় সভা হয়। কিন্তু সমাধান কিছুই হয়নি।
এবার শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ৮-৯ কিলোমিটার দূরে আশীদ্রোন ইউনিয়নের মতিগঞ্জ এলাকায় হাইল হাওরের পাশে সরকারি খাসজমিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জায়গাটি সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা প্রশাসন ও পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগসহ সংশ্লিষ্টরা পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু এবারও একই আপত্তি।
শহরের ময়লা হাওরে নয়
গত ২৭ সেপ্টেম্বর মতিগঞ্জ গ্রামের হাইল হাওর এলাকায় পৌরসভার ময়লা ফেলার উদ্যোগের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেন ’সচেতন এলাকবাসী’। তাঁদের আশঙ্কা, সেখানে বর্জ্য ফেলা হলে হাইল হাওরের পানি, মাছ, জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রতিবাদ সভায় স্থানীয়রা বলেন, শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধানের নামে হাওরের পরিবেশের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। তাঁদের দাবি, পরিবেশগত সমীক্ষা, স্থানীয় জনগণের মতামত এবং নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিশ্চয়তা ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত নয়। স্থানীয়দের এই আপত্তির ফলে আবারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার দীর্ঘদিনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা।
তবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এই আশংকা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘প্রক্রিয়াটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। হাইল হাওরের জীব-বৈচিত্র, পরিবেশগত সমীক্ষা, স্থানীয় জনগণের মতামত এবং নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিশ্চয়তা ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে না।’ তিনি বলেন, ‘হাওরাঞ্চলে কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপনের আগে পানি প্রবাহ, বর্ষাকালে জলমগ্ন হওয়ার সম্ভাবনা, ভূগর্ভস্থ পানি, মাছ ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল এবং আশপাশের কৃষিজমির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করা হবে।’
শ্রীমঙ্গল পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি জায়গা খোঁজা হচ্ছিল। আগের উদ্যোগগুলো নানা কারণে বাস্তবায়িত হয়নি। এবার হাইল হাওর এলাকায় যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেখানে শুধু ময়লা ফেলে রাখার কথা নয়; বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জৈব বর্জ্য থেকে সার তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। স্থানীয় বিরোধের বিষয়টি দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের ঈরঃু জবমরড়হ উবাবষড়ঢ়সবহঃ চৎড়লবপঃ ও চজঅইজওউউঐও প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়নাধীন। প্রকল্পটির কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় রয়েছে সুইজারল্যান্ড সরকারের উন্নয়ন সংস্থা ঝরিংংপড়হঃধপঃ এবং বিশ্বব্যাংকের সহযোগী অর্থায়নে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকা বাজেটে সেখানে স্যানিটারি ল্যান্ডফিল, বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদন প্লান্ট ও রিসাইক্লিং ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, কলেজ রোডের ভাগাড় সরানোর দাবিতে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের আন্দোলনও পুরোনো। ২০১৭ সালে সরকারি কলেজ, বাডস্ রেসিডেনসিয়্যাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও গাউছিয়া শফিকিয়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী-শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকাবাসী ভাগাড় সরানোর দাবিতে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দিয়েছিলেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও শিক্ষার্থীরা একই দাবিতে আন্দোলন করেছে। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে জেলা প্রশাসকের আশ্বাসের পর আন্দোলন স্থগিতের কথা এবং পরে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর তথ্যও প্রকাশিত হয়।
ফলে একই জায়গা নিয়ে আন্দোলন, প্রশাসনের আশ্বাস এবং পৌরসভার উদ্যোগ সবই চলছে বছরের পর বছর।

প্রতিশ্রুতির তালিকায় ভাগাড়
শ্রীমঙ্গলের ময়লার ভাগাড় এখন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিরও অংশ।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রার্থী প্রীতম দাশ কলেজ রোডের ময়লার ভাগাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, এই ভাগাড় শ্রীমঙ্গলবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের প্রতীক; আশপাশের তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, একটি মসজিদ ও বাসিন্দারা দুর্গন্ধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছেন। নির্বাচিত হলে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দেন তিনি।
সমস্যা কি শুধু ‘জায়গা’ নিয়ে?
পরিবেশবিদ সৈয়দ আমিরুজ্জামানের মতে, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অর্থ শুধু শহরের ময়লা অন্য একটি জায়গায় নিয়ে গিয়ে স্তুপ করা নয়। প্রয়োজন বর্জ্য পৃথকীকরণ, জৈব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করা, লিচেট নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং পরিবেশগত প্রভাব মুল্যায়ন।
বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপনের আগে পানি প্রবাহ, বর্ষাকালে জলমগ্ন হওয়ার সম্ভাবনা, ভূগর্ভস্থ পানি, মাছ ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল এবং আশপাশের কৃষিজমির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।
তাই প্রশ্ন উঠছে -হাইল হাওরের প্রস্তাবিত জায়গাটি কি প্রকৃত অর্থেই নিরাপদ ও উপযুক্ত? সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র হলে বর্ষাকালে পানির সঙ্গে বর্জ্য বা দূষিত তরল ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে কি না? প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত সমীক্ষা হয়েছে কি না? স্থানীয় জনগণের আপত্তি কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে? এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হযে দেখা দিয়েছে।
এক এলাকার দুর্গন্ধ অন্য এলাকায় নয়
শ্রীমঙ্গরের নাগরিকদের বড় অংশের দাবি, বর্তমান কলেজ রোডের ভাগাড় দ্রুত সরানো হোক। একই সঙ্গে নতুন জায়গার মানুষও বলছেন, তাঁদের এলাকায় যেন একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি না হয়।
অর্থাৎ একদিকে শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনবসতির স্বাস্থ্যঝুঁকি; অন্যদিকে হাইল হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের সম্ভাব্য ঝুঁকি-দুই পক্ষের দাবির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে পৌরসভা ও প্রশাসন।
শহরের ময়লা সরাতে গিয়ে যদি হাওরের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না; শুধু সমস্যার ঠিকানা বদলাবে।
শ্রীমঙ্গলবাসীর প্রত্যাশা খুব সরল, শহরের স্কুল-কলেজের সামনে আর ময়লার পাহাড় থাকবে না। কিন্তু সেই ময়লার পাহাড় সরাতে গিয়ে হাইল হাওরের বুকেও যেন নতুন কোনো বিপর্যয়ের বীজ বোনা না হয়।

















